হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা চরমে

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই জাহাজ আটক, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকি

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই জাহাজ আটক, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকি

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ২৩ এপ্রিল: 

পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানি বাহিনী এই প্রণালিতে দুটি জাহাজ আটক করেছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ জোরদারের অবস্থান নিয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি “প্রকাশ্য যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন” চালিয়ে যায়, তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা “অসম্ভব” হয়ে উঠবে। তাঁর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, বিশ্ব অর্থনীতিকে “জিম্মি” করা এবং ইসরায়েলের “যুদ্ধ উসকানি” অন্তর্ভুক্ত।

তিনি আরও দাবি করেন, সামরিক চাপ বা হুমকির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ব্যর্থ হবে।

জাহাজ আটক ও সামরিক উত্তেজনা

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি জাহাজ আটক করেছে এবং সেগুলোকে তীরে নিয়ে গেছে।

জানা গেছে, আটক জাহাজ দুটি হলো পানামা পতাকাবাহী MSC Francesca এবং লাইবেরিয়া নিবন্ধিত Epaminondas। অভিযোগ করা হয়েছে, জাহাজ দুটি গোপনে প্রণালি ত্যাগের চেষ্টা করছিল।

এদিকে, একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, বুধবার এই জলপথে একাধিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় ইরানি গানবোট থেকে গুলি চালানো হয়, যাতে একটি জাহাজের ব্রিজ অংশে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এই প্রথম যুদ্ধ শুরুর পর ইরান সরাসরি জাহাজ দখল করল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি জাহাজ আটক ও তল্লাশি চালানোর ঘটনা ঘটিয়েছিল।

ট্রাম্পের অবস্থান ও অবরোধনীতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার আগে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, সামরিক হামলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পরে অবশ্য তিনি ঘোষণা দেন, তাৎক্ষণিক হামলা না হলেও অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

এই অবরোধ ও পাল্টা অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

এই সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। এশিয়ার জ্বালানি নির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি, সার ও কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে। ইউরোপও এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

জার্মানি তার ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। গ্রিস খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় শত শত মিলিয়ন ইউরোর সহায়তা ঘোষণা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় এই সংকট চললে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

মানবিক সংকট ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা

জাতিসংঘের সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং দুই হাজারের বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে।

অন্যদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার প্রচেষ্টা চললেও তা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের উদ্যোগেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত

এই উত্তেজনার পাশাপাশি ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননে সংঘর্ষ আরও বাড়ছে। সাম্প্রতিক হামলায় কয়েকজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সাংবাদিকও রয়েছেন।

লেবানন জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছে।

এদিকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।