‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

ক্ষুধা কমানোর গতি থমকে বাংলাদেশে, শিশুদের তীব্র অপুষ্টি ১২.৯ শতাংশ

ক্ষুধা কমানোর গতি থমকে বাংলাদেশে, শিশুদের তীব্র অপুষ্টি ১২.৯ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৬ অক্টোবর :

ক্ষুধা নিরসনে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালের পর থেকে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (জিএইচআই) দেশের স্কোরের উন্নতি হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। অথচ ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এই উন্নতির হার ছিল ৪২ শতাংশের বেশি। নতুন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২২টি দেশের মধ্যে ৮৪তম। স্কোর ১৯ দশমিক ২ নিয়ে দেশটি এখনো মাঝারি মাত্রার ক্ষুধার শ্রেণিতে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি শিশুদের তীব্র অপুষ্টিতে, যার হার বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর ২০১৮ সালের ২০ থেকে কমে ১৯ দশমিক ২ হয়েছে। সূচকে স্কোর যত কম, ক্ষুধার পরিস্থিতি তত ভালো বলে বিবেচিত হয়। তবে গত কয়েক বছরে উন্নতির গতি কমে যাওয়ায় ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় দেশের অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

শিশুদের তীব্র অপুষ্টির চিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের হার ছিল ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। সর্বশেষ মূল্যায়নে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে—২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ। এ ধরনের অপুষ্টি শিশুদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যুর আশঙ্কাও তৈরি করে।

তবে পুষ্টি পরিস্থিতির সব সূচকেই অবনতি হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের খর্বাকৃতির হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই হার ছিল ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ, যা সর্বশেষ মূল্যায়নে নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে। ২০০০ সালে হারটি ছিল ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই দশকের বেশি সময়ে শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৩০ শতাংশীয় পয়েন্টেরও বেশি কমেছে।

খর্বাকৃতি সাধারণত দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও অপর্যাপ্ত পুষ্টির প্রতিফলন। এর হার কমে আসা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। প্রতিবেদনে এই অগ্রগতিকে এক প্রজন্মজুড়ে অর্জিত পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

জনসংখ্যার মধ্যে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের অনুপাতও কমেছে। ২০১৮ সালে এ হার ছিল ১২ দশমিক ১ শতাংশ, সর্বশেষ হিসাবে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশে নেমেছে।

গবেষণায় শিশুদের খর্বাকৃতির হার কমার পেছনে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকদের শিক্ষার উন্নতি, বিশেষ করে মায়েদের শিক্ষার অগ্রগতি, পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতি। জনমিতিক পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও অঞ্চলটির সামগ্রিক ক্ষুধা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের সূচকে ভারতের স্কোর ২৪ দশমিক ১, পাকিস্তানের ২৫ দশমিক ৫ এবং আফগানিস্তানের ২৮ দশমিক ৬। দেশ তিনটি গুরুতর ক্ষুধার শ্রেণিতে রয়েছে। অন্যদিকে, নেপালের স্কোর ১৪ দশমিক ৫ এবং শ্রীলঙ্কার ১০ দশমিক ২; উভয় দেশই মাঝারি মাত্রার ক্ষুধার শ্রেণিতে রয়েছে।

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্কোর ২৪, যা গুরুতর ক্ষুধার শ্রেণিতে পড়ে। বিশ্বব্যাপী গড় স্কোর ১৮ দশমিক ১—মাঝারি মাত্রার ক্ষুধার পর্যায়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত, জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক ধাক্কার মতো একাধিক সংকট বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা কমানোর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক চারটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়—জনসংখ্যার অপুষ্টি, শিশুদের তীব্র অপুষ্টি, শিশুদের খর্বাকৃতি এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার। এসব সূচক একত্র করে ক্ষুধার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্জন সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুধা কমানোর গতি কমে যাওয়া এবং শিশুদের তীব্র অপুষ্টির হার বেড়ে যাওয়া স্পষ্ট সতর্কসংকেত। পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্র পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এত দিনের অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।