শাহজালাল (রহ.) দরগাহের দান খয়রাত নিয়ে মতামত জানালেন প্রধান মোতাওয়াল্লী
সিলেট প্রতিনিধি, ভয়েস অব পিপল:
সিলেটের ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ পরিচালনা নিয়ে চলমান অস্থিরতায় নতুন মোড় এসেছে। দীর্ঘদিন নীরব থাকা দরগাহের প্রধান মোতাওয়াল্লী সরেকুম ফতেহ উল্লাহ আল আমান এবার প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, স্বচ্ছতার বিরুদ্ধে তারা নন, তবে দরগাহ পরিচালনায় সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।

সরেকুম ফতেহ উল্লাহ আল আমান
ঘটনার শুরু থেকেই অনেকটা আড়ালে ছিলেন সরেকুম ফতেহ উল্লাহ আল আমান। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান জানানো হলেও পরবর্তীতে তিনি নীরব ছিলেন। তবে সম্প্রতি সরকারের উদ্যোগে নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন এবং দরগাহ পরিচালনায় পরিবর্তন আসার পর তিনি গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন।
সরকারের হস্তক্ষেপের পর বর্তমানে সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগে চালু করা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় দরগাহের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। যদিও এই কমিটির মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী নয়, তবে এক মাসের মধ্যে দরগাহের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও পরিচালন কাঠামো নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্ত—সবার প্রধান দাবি একটাই, দরগাহের আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এই দাবির সঙ্গে একমত দরগাহ কর্তৃপক্ষও। তবে চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
শনিবার দরগাহের দানবাক্সের টাকা গণনার সময় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরেকুম ফতেহ উল্লাহ আল আমান। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
তিনি বলেন, “আমরাও স্বচ্ছতার বিরুদ্ধে নই। জনসম্মুখে টাকা গণনা করা হচ্ছে, এটা ভালো উদ্যোগ। তবে টাকা কোন খাতে এবং কীভাবে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।”
মোতাওয়াল্লী দাবি করেন, বংশ পরম্পরায় তারা দরগাহের মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের মতে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শত শত বছর ধরে এই ব্যবস্থা চলে আসছে।
তিনি বলেন, “আমরা বারবার বলেছি, আপনারা একটি গাইডলাইন দেন। এই টাকা কীভাবে, কোথায় খরচ হবে সেটি নির্ধারণ করা হোক। আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”
সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এটা আমাদের দায়িত্বের বিষয় ছিল। এখন সরকার এসে হস্তক্ষেপ করছে। ভক্ত ও খাদেম পরিবারের অনেকেই বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারছেন না।”
তবে তিনি একই সঙ্গে জানান, প্রয়োজনে তারা আইনি পথেও যেতে পারেন। তার ভাষায়, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি এমন হলে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
এদিকে, দরগাহের দানবাক্সের অর্থ নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দ্বিতীয় দফায় গণনা শেষে দেখা গেছে, ১৮ দিনে দানবাক্সে জমা হয়েছে ৪৮ লাখ টাকার বেশি। এর আগে সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সময়ে তিন দিনে জমা হয়েছিল ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
গত ১৮ জুন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম দরগাহের দানবাক্স নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করেন। দানবাক্সগুলো সিলগালা করে রাখা হয় এবং অর্থ জমা হচ্ছে পৃথক দরগাহ ফান্ডে।
এর ফলে প্রায় ২৫ দিন ধরে আগের নিয়মে দানের অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না দরগাহ কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় নিয়ে সংকটের কথা জানিয়েছে মাজার কর্তৃপক্ষ।
ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও সিউক চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান লোদী কয়েস জানিয়েছেন, আগামী বৈঠকে দানের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম কেন্দ্র শাহজালাল (রহ.) দরগাহ ঘিরে চলমান এই পরিস্থিতিতে এখন সবার নজর নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের দিকে। ভক্ত, প্রশাসন ও দরগাহ কর্তৃপক্ষ—সব পক্ষই চাইছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে নিশ্চিত হবে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা।