তফসিল ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই
কলিকালের কলধ্বণি–৪৪ ।। ওসমান হাদীকে দিয়ে নির্বাচনি সহিংসতার সূচনা : এর শেষ কাকে দিয়ে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা। খুশি হয়েও খারাপ হয়ে গেল মনটা। এর মধ্যেই ঢাকার বুকে প্রকাশ্য দিবালোকে স্বতন্ত্র প্রার্থী, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করে গুলি। মাত্র ৩৩ বছরের হাদী হয়েছেন এই নির্বাচনি সহিংসতার প্রথম বলী। তাহলে ফেব্রুয়ারিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে—এ কথা কীভাবে বলি? যেন তফসিল ঘোষণার প্রথম ঘণ্টাতেই দেশবাসীকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো—এই নির্বাচনের চেহারা কেমন হতে যাচ্ছে।

শরিফ ওসমান হাদি এখন লাইফ সাপোর্টে। তার পরিবার প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তা নিয়ে বসে আছে। আর দেশের অন্য প্রার্থীরা শঙ্কা গোপন করতে পারছেন না—আজ হাদি, কাল কি তবে অন্য কেউ?
নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা, মতের ভিন্নতা, মতের লড়াই। কিন্তু প্রতিযোগিতা যখন অস্ত্রের মুখে অসহায় হয়ে পড়ে, তখন তা গণতন্ত্রের প্রতিযোগিতা নয়—বরং ক্ষমতাকেন্দ্রিক বা আধিপত্যবাদী শক্তির নীরব বার্তা। হাদির ওপর হামলার আগেই তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন—
লাগাতার হুমকি, নজরদারি, পরিবারের নারী সদস্যদের ধর্ষণের ভয়, বাড়িতে আগুন লাগানোর সতর্কতা।
এসব কি ছিল কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি এটি ছিল হামলার আগাম বার্তা?
এর আগেই চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. এরশাদ উল্লাহর ওপর গুলিবর্ষণ, পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রকাশ্য গোলাগুলি—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে:
এই নির্বাচন কি সত্যিই নিরাপদ? নাকি আগেই সহিংসতার নীলনকশা তৈরি হয়ে গেছে?
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানিয়েছেন—হাদিকে গুলি করা সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা হয়েছে, যে কোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু হামলার পর এসব আশ্বাস আমরা বহুবার শুনেছি।
এ ঘটনার পর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ড. ইউনূস এটিকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ওপর সুপরিকল্পিত আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম—এই হামলা পরাজিত শক্তির দুঃসাহসিক উত্থান, যা যেকোনো মূল্যে ব্যর্থ করা হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন—দেশ এখন গভীর সংকটে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সব গণতন্ত্রকামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
মহাসচিব মির্জা ফখরুল আরও স্পষ্টভাবে বলছেন—
“এটি রাজনীতির জন্য অশনি সংকেত; একটি চক্রান্তের অংশ। এখনই না থামালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।” জামায়াতের নেতারাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই শব্দগুলো—চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, ফ্যাসিস্ট শক্তি—কেবল রাজনৈতিক আলঙ্কারিক শব্দ নয়; দেশের বাস্তবতা বলছে—একটি সংগঠিত সহিংসতা ঘনিয়ে আসছে।
ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন—স্বতন্ত্র ও বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের ওপর হামলা নির্বাচনী অংশগ্রহণকে ব্যাহত করবে, বিশেষ করে যেসব আসনে অতীতে সহিংসতা হয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জরুরি। আরেক অধ্যাপক কামরুন নাহারের পর্যবেক্ষণ—তফসিল ঘোষণার পরদিনই গুলি হওয়া কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশের লক্ষণ নয়।
পুলিশের আইজি মো. বাহারুল আলম জানিয়েছেন—দেশব্যাপী ‘অলআউট অভিযান’ চালানো হবে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—
হাদির প্রকাশিত ভয়াবহ হুমকির পোস্টগুলো কি গোয়েন্দারা দেখেননি?
দেখে কি তারা কিছুই করতে পারেননি?
নাকি কিছু করার প্রয়োজনই মনে করা হয়নি?
হামলার পর গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর গল্প আমাদের পরিচিত।
মূল প্রশ্ন—আগে কেন রক্ষা করা গেল না?
আজকের বড় প্রশ্ন—
এই সহিংসতার শেষ কাকে দিয়ে হবে?
নির্বাচনের আগের পরিবেশই যখন রক্তাক্ত হয়ে ওঠে, যখন সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীরাও নিরাপদ নন—তখন এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
আমরা কি আবারও কোনো ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী অসহিষ্ণুতার চক্রে ঢুকে পড়ছি?
নাকি পরিকল্পিতভাবে একটি নির্বাচনহীনতার পথ তৈরি করা হচ্ছে?
আরেকটি বড় প্রশ্ন—
এ সহিংসতার শেষপ্রান্ত কোথায়? এর শেষ কাকে দিয়ে হবে?
সরকার, অন্তর্বর্তী প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন—সবাইকে নাগরিকেরা একই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—
প্রার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে কি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে?
সহিংস এলাকায় সেনা বা অতিরিক্ত বাহিনী কি মোতায়েন করা হবে?
অপরাধীরা দ্রুত গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি হবে কি?
নাকি আবারও দেখব—হামলার পর গভীর নীরবতা?
নির্বাচন কোনো দল বা সরকারের সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের অধিকার। আর জনগণের অংশগ্রহণ যদি ভয়, আতঙ্ক আর মৃত্যুশঙ্কায় বাধাগ্রস্ত হয়—তবে গণতন্ত্র শুধু দুর্বল হয় না, অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
শরিফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ দেহ আজ যে প্রশ্নগুলো সামনে ছুঁড়ে দিয়েছে—সেগুলো প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রশ্ন।
তফসিল ঘোষণার পরপরই গুলি—এটা কেবল একজন হাদির ওপর হামলা নয়; এটি আগাম সতর্কবার্তা—
গণতন্ত্রের পথে আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়ের শুরু হচ্ছে কি না।
প্রশ্ন এখন একটাই—
আমরা কি এই অন্ধকারের শেষ দেখতে পাবো? নাকি আরও রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে?
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাকে অধ্যাপক।
লন্ডন, ১২/১২/২০২৫