সিলেটে ক্ষতিগ্রস্ত ৯৮ হাজার কৃষকের তালিকা তৈরি , সহায়তা দেবে সরকার

সিলেটে ক্ষতিগ্রস্ত ৯৮ হাজার কৃষকের তালিকা তৈরি , সহায়তা দেবে সরকার

সিলেট প্রতিনিধি, ১০ মে: 

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ৯৮ হাজার কৃষকের তালিকা তৈরি করেছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব কৃষককে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। তালিকা তৈরির কাজ এখনও অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ দুর্ভোগের মধ্যে এই ঘোষণাকে সামান্য হলেও আশার আলো হিসেবে দেখছেন হাওরপাড়ের মানুষ।

শনিবার কড়া রোদ উঠায় অনেক কৃষক ভেজা ধান ও পচা খড় শুকাতে সক্ষম হয়েছেন। উঠোনে ছড়িয়ে রাখা ধান আর খড়ের স্তূপে ব্যস্ত কৃষকদের দৃশ্য দূর থেকে কিছুটা স্বস্তির ছবি তৈরি করলেও বাস্তবে হাওরের বহু এলাকায় এখনো হতাশা আর কান্নার চিত্রই স্পষ্ট।

কারণ, অসংখ্য কৃষকের ধান এখনো পানির নিচে কিংবা কাদার সঙ্গে মিশে পচে জমাট বেঁধে আছে। এসব ধান আর চাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পানি কিছুটা নেমে গেলেও গভীর হাওর থেকে ধান ঘরে তোলা যাচ্ছে না। হাওরের ভেতরের মাটির রাস্তা—স্থানীয় ভাষায় “গোপাট”—এখন এতটাই বেহাল যে সেখানে ট্রাক্টর চলতে পারছে না। অনেক স্থানে কৃষকেরা মাথায় করে ধানের আঁটি আনতেও ব্যর্থ হচ্ছেন। কোথাও কোথাও নৌকাও চলাচল করতে পারছে না।

তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি জাতীয় সংসদেও তুলে ধরা হয়েছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৯৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে এবং আরও তথ্য সংগ্রহ চলছে।

হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, এবার যেন তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। শাল্লা, দিরাই, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বহু এলাকায় কৃষকেরা এখন ঋণের চাপে দিশেহারা। অনেকেই ধারদেনা করে বোরো চাষ করেছিলেন। এখন ফসল না থাকায় পাওনাদারের চাপ সামলাতে পারছেন না।

দেখার হাওরের রৌয়ারপাড় এলাকার হাছনপছন্দ গ্রামের কৃষক ইনচান আলী এ বছর প্রায় আট একর জমিতে আবাদ করেছিলেন। কিন্তু এক কাঠা জমির ধানও কাটতে পারেননি। সব পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিভিন্নজনের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি চাষ করেছিলেন।

চোখ ভেজা কণ্ঠে ইনচান আলী বলেন, “ধান পেলে ছয়-সাতশ মণ ধান হতো। ঋণ শোধ হয়ে যেত। এখন পাওনাদারেরা বাড়িতে আসছে। পাঁচ ছেলে-মেয়ে নিয়ে কীভাবে বাঁচবো বুঝতে পারছি না।”

একইভাবে গুয়ারছড়া গ্রামের কৃষক সাহেব আলীও সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ করে চাষ করেছিলেন। অর্ধেক জমির ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। হতাশা আর মানসিক চাপে তিনি খলায় কাজ করার সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, গুয়ারছড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকার অন্তত ২০ জন বর্গাচাষি এবার ঋণ করে চাষ করে ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। গোখাদ্যের অভাবে অনেকে কম দামে গরু বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছেন।

হাওরে এখন রোদ উঠেছে, কিন্তু কৃষকের জীবনে জমে থাকা অনিশ্চয়তার কালো মেঘ এখনো কাটেনি। সরকারি সহায়তার আশ্বাস তাদের কিছুটা সাহস দিলেও, সেই সহায়তা কত দ্রুত মাঠে পৌঁছায়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো হাওরাঞ্চল।