ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

অস্বাস্থ্যকর খাবার কমাতে সরকারের উদ্যোগ ঠেকাতে মামলা করছে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো

অস্বাস্থ্যকর খাবার কমাতে সরকারের উদ্যোগ ঠেকাতে মামলা করছে বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো

ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ২ আগস্ট:

বিশ্বজুড়ে স্থূলতা ও খাদ্যজনিত রোগ মোকাবিলায় সরকারগুলোর নেওয়া উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করছে বড় বড় আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড (অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার) কোম্পানিগুলো—এমন অভিযোগ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক ড. টেড্রস আধানম গেব্রিয়েসুস।

তিনি বলেছেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিভিন্ন দেশের সরকার যখন অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর উপাদানসমৃদ্ধ খাবারের ব্যবহার কমাতে নীতি গ্রহণ করছে, তখন অনেক খাদ্য কোম্পানি আদালতের আশ্রয় নিয়ে এসব উদ্যোগ বিলম্বিত বা দুর্বল করার চেষ্টা করছে। এতে দেশগুলোকে স্বাস্থ্য ও আইনি খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ডব্লিউএইচও প্রধানের এই মন্তব্য এসেছে একটি আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের পর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সরকারি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অন্তত ২৩৫টি মামলা করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে বলা হয়, এসব মামলার বড় অংশের লক্ষ্য ছিল খাবারের প্যাকেটে সতর্কতামূলক লেবেল, জাঙ্ক ফুডের ওপর কর এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের মতো নীতিগুলো আটকে দেওয়া।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে স্থূলতার সংকট

ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ স্থূলতায় আক্রান্ত ছিলেন, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় প্রতি সাতজনে একজন। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের প্রায় অর্ধেক অংশ এখন অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে আসে। চিপস, চিনিযুক্ত পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংসজাত পণ্য এর মধ্যে অন্যতম।

‘মামলা করে সময়ক্ষেপণ করছে কোম্পানিগুলো’

ড. টেড্রস বলেন, অনেক খাদ্য কোম্পানি প্রকাশ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পক্ষে অবস্থানের কথা বললেও বাস্তবে তারা অনেক সময় এমন নীতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করছে, যা জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব মামলার উদ্দেশ্য শুধু আইনি জয় নয়; বরং নতুন আইন কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা এবং অন্য দেশগুলোকেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশেই খাদ্য কোম্পানিগুলো পরাজিত হয়েছে। তবে মামলা চলাকালে নীতি বাস্তবায়নে বছরের পর বছর দেরি হয়েছে।

ডব্লিউএইচও প্রধানের ভাষায়, এসব আইনি লড়াইয়ের কারণে প্রায় ৬০০ বছর সমপরিমাণ সম্মিলিত আইনি সময় ব্যয় হয়েছে, যেখানে প্রতিটি মামলায় গড়ে প্রায় আড়াই বছর সময় লেগেছে।

কোকা-কোলা, পেপসিকোসহ বড় কোম্পানির নাম

অনুসন্ধানে চিহ্নিত মামলাগুলোর মধ্যে বেশ কিছুতে বিশ্বের বড় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে The Coca-Cola Company, PepsiCo, Mondelēz International, Kellanova এবং Danone

তবে এসব কোম্পানি দাবি করে, তারা ভোক্তাদের সচেতন পছন্দের সুযোগ দিতে কাজ করছে এবং নিজেদের পণ্যকে আরও স্বাস্থ্যকর করার উদ্যোগ নিচ্ছে।

ড. টেড্রস বলেন, কোম্পানিগুলো যদি সত্যিই স্থূলতা সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে তাদের উচিত জনস্বাস্থ্য নীতির বিরুদ্ধে মামলা বন্ধ করা।

সরকারগুলোর জন্য সতর্কবার্তা

ডব্লিউএইচও প্রধান বলেন, খাবারের প্যাকেটে স্পষ্ট সতর্কবার্তা, অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার উৎসাহিত করার নীতিগুলো অনেক দেশে ইতিবাচক ফল দিয়েছে।

তিনি বলেন, তবে এসব উদ্যোগ এখনো মূলত ধনী ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ। দরিদ্র দেশগুলোতে যেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি, সেখানে নীতি গ্রহণের সক্ষমতা কম থাকায় বৈষম্য আরও বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আহ্বান—সরকারগুলো যেন জনস্বাস্থ্য রক্ষার নীতি বাস্তবায়নে পিছিয়ে না আসে এবং খাদ্য শিল্পের প্রভাবের মধ্যেও নাগরিকদের স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

ভয়েস অব পিপল বিশ্লেষণ:
অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাণিজ্যিক খাত। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মুনাফার সঙ্গে যখন মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি জড়িয়ে যায়, তখন সরকারের দায়িত্ব শুধু বাজার রক্ষা নয়—বরং জনগণের জীবন ও সুস্থতা রক্ষা করা।