তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
চাকরির ফাঁদে গিয়ে রাশিয়া, ২৯ দেশের নাগরিক গিয়েছে ফাঁসিয়া !
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৮ অক্টোবর :
ভালো বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা। বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের পুরুষকে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। অনেককে রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করে যুদ্ধক্ষেত্রের বিপজ্জনক সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের তদন্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় দালাল চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে অথবা ব্যবসায়িক ভিসার ব্যবস্থা করে লোকজনকে রাশিয়ায় নিয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের অনেকেই ছিলেন আর্থিকভাবে অসচ্ছল। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া এবং এমন ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করানোর অভিযোগ রয়েছে, যা তাঁরা বুঝতে পারতেন না।
জাতিসংঘের তদন্তে বলা হয়েছে, প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এসব ব্যক্তির অনেকে নিহত হয়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। কেউ কেউ ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন কিংবা যুদ্ধবন্দি হয়েছেন। তদন্ত কমিশন রুশ কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ করা এবং মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের সশস্ত্র বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশিদের নিয়ে আগেও সতর্কতা
রাশিয়ায় বেসামরিক চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিদের নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর ঘটনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ব্র্যাকের অভিবাসনবিষয়ক অনুসন্ধানে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি পুরুষের বিষয়ে তথ্য উঠে আসে, যাঁদের রাশিয়ায় চাকরির আশ্বাস দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
২০২৬ সালের মার্চে ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ প্রতিবেদনে অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ার যুদ্ধে নিয়োগের তথ্য তুলে ধরা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।
বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লোকজনকে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে বাধ্য করার অভিযোগে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া, পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঋণের বোঝা, অনিশ্চয়তায় পরিবার
বিদেশে চাকরির আশায় অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে দালালদের টাকা দেয়। কিন্তু স্বজন রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পরিবারগুলো পড়ে চরম অনিশ্চয়তায়। কেউ জানতে পারেন না তাঁদের স্বজন বেঁচে আছেন কি না, আবার কেউ মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিশ্চয়তা পান না।
জাতিসংঘের অনুসন্ধান আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও প্রতারণামূলক নিয়োগের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। চাকরির নামে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, ভিসার ধরন, লিখিত চুক্তি এবং প্রকৃত কাজের বিবরণ যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে যে চুক্তির ভাষা চাকরিপ্রার্থী বোঝেন না, তা না বুঝে সই করা বিপজ্জনক হতে পারে।