তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
‘অপারেশন লেংড়া’: ভারতে সংখ্যালঘুদের অত্যাচারের আরেক নির্মম রূপ
ভারত প্রতিনিধি, ২৫ অক্টোবর:
ভারতের উত্তর প্রদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ‘অপারেশন লেংড়া’ নামে পরিচিত পুলিশের একটি কৌশল নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে শত শত ব্যক্তিকে গুলি করে আহত করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় আক্রান্তদের অধিকাংশই মুসলিম। অনেককে হাঁটু বা হাঁটুর নিচে গুলি করা হয়েছে, যার ফলে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতা হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার প্রায় ৬৫০টি ঘটনার নথি সংগ্রহ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট। এপি ওই নথি থেকে ২০০টির বেশি ঘটনা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে—এমন ৬২৭টি ঘটনার মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি আহত ব্যক্তি মুসলিম। অন্য একটি হিসাবে এ হার প্রায় ৯৩ শতাংশ।
তবে এ তথ্য কেবল গরু পাচার-সংক্রান্ত অভিযোগে পুলিশের গুলিতে আহত ব্যক্তিদের নিয়ে; ভারতের সব ধরনের পুলিশি সহিংসতার চিত্র এটি নয়।
একই কায়দায় পায়ে গুলি

এপি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। পুলিশের প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়, অভিযুক্তরা পালানোর চেষ্টা করেছেন বা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন। এরপর আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালিয়ে তাঁদের আহত করেছে।
কিন্তু অনেক ঘটনায় গুলি লেগেছে পায়ের একই অংশে—বিশেষ করে হাঁটুর নিচে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের পুলিশি অভিযানের কৌশলকে ‘অপারেশন লেম’ নামে উল্লেখ করা হচ্ছে।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ কালিম খান গুলির আঘাতের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি পালানোর সময় দূর থেকে গুলি ছুড়ে তার পায়ের পেশির মধ্য দিয়ে অনুভূমিকভাবে গুলি প্রবেশ করানো এবং হাড়ে আঘাত না লাগার ঘটনা ব্যাখ্যা করা কঠিন। এ ধরনের ক্ষত কাছ থেকে লক্ষ্য করে গুলি করার ইঙ্গিত দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত শাস্তির অভিযোগ

মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিরোধী রাজনীতিকদের অভিযোগ, অপরাধের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গুলি করে অক্ষম করে দেওয়ার প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।
নয়াদিল্লির মানবাধিকার আইনজীবী মঙ্গলা ভার্মার মতে, এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত পুলিশি চর্চায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কাউকে হত্যা বা আহত করে দেওয়ার মাধ্যমে পুলিশ নিজেই যেন বিচার সম্পন্ন করছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া বিপজ্জনক।
উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টও পুলিশের গুলির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদালত পর্যবেক্ষণ করে, অভিযুক্তদের পায়ে গুলি করার ঘটনা যেন নিয়মিত চর্চায় পরিণত হচ্ছে। আদালত বলেছে, পুলিশ বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না এবং আইন অনুযায়ী এসব ঘটনার প্রতিবেদন ও তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
পঙ্গুত্বের শিকার, বিপর্যস্ত পরিবার

এপি উত্তর প্রদেশে পুলিশের গুলিতে পায়ে আহত ছয় মুসলিম ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা প্রতিশোধ বা হয়রানির আশঙ্কায় পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই ছয় ব্যক্তি কারাগারে ছিলেন অথবা আত্মগোপনে ছিলেন।
একজন মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছেলে মহিষ কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর তিনি আর আগের মতো কাজ করতে পারছেন না। ফলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আরেক নারী জানান, তাঁর ছেলেকে দুই হাঁটুতে গুলি করা হয়েছিল। ছেলের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে পরিবারকে ঋণ নিতে হচ্ছে।
এ ঘটনাগুলো দেখায়, পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পরিণতি শুধু শারীরিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারালে পুরো পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
উত্তর প্রদেশ পুলিশের এ বিষয়ে উত্তর

উত্তর প্রদেশ পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ এপিকে ‘অপারেশন লেংড়া’র বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পুলিশকে কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করার কোনো নীতিগত নির্দেশ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
আঘাতের ধরনে একই রকম প্রবণতার বিষয়ে উপযুক্ত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি। গরু ব্যবসার সঙ্গে মুসলিমদের সম্পৃক্ততার কারণে অভিযুক্তদের মধ্যে মুসলিমের অনুপাত বেশি হতে পারে বলেও তাঁর বক্তব্য।
তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, একই ধরনের আঘাতের পুনরাবৃত্তি এবং আহতদের ধর্মীয় পরিচয়ের অনুপাত স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।
ধর্মীয় বৈষম্যের প্রশ্ন
ভারতে গরু জবাই ও গরু পরিবহন নিয়ে আইন এবং রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। হিন্দু ধর্মের একটি বড় অংশের কাছে গরু পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। এ কারণে গরু সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকে ঘিরে বিভিন্ন রাজ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই নীতির প্রয়োগে মুসলিম সংখ্যালঘুরা অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পুলিশ অবশ্য ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের মার্চে আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তর প্রদেশে পুলিশের সঙ্গে কথিত সংঘর্ষে ৩১৬ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন মুসলিম বলে রাজ্য পুলিশের তথ্য থেকে জানা গেছে। তবে পুলিশের গুলিতে আহত ব্যক্তিদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন
অপরাধের অভিযোগ থাকলেই কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার পুলিশের নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের। তাই আত্মরক্ষার দাবি সত্য কি না, গুলি চালানো প্রয়োজনীয় ছিল কি না এবং কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী অসমভাবে আক্রান্ত হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার ঘটনাগুলোর মধ্যে গুরুতর অসংগতি ও বৈষম্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাকে পৃথকভাবে তদন্ত করা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।