কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮২ ।। কিন্তু কিন্তু’ সাংবাদিকতায় অস্থির জাতি !

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮২ ।।    কিন্তু কিন্তু’ সাংবাদিকতায় অস্থির জাতি !

উৎসর্গ

বাংলা ভাষার প্রতি দায়বদ্ধ সকল বক্তা, সাংবাদিক ও জনবক্তার উদ্দেশে

বেশ কয়েক বছর ধরে টেলিভিশনের পর্দা, ইউটিউব আলোচনা, ফেসবুক লাইভ, এমনকি ওয়াজ–বক্তৃতা মন দিয়ে শুনলে একটি শব্দ বারবার কানে লাগে—“কিন্তু”। শুধু একবার নয়, অনেক সময় টানা দু’বার—“কিন্তু… কিন্তু…।” বাক্যের মাঝখানে, শুরুতে, অকারণে, অপ্রয়োজনে। জনপ্রিয় টিভি টক শো ‘তৃতীয় মাত্রা’ বা এ ধরনের আরও অন্যান্য টকশোগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজারবার ‘কিন্তু’ কিন্তু’ শব্দটি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। তাই এই ‘কিন্তু’ নিয়ে কিছু না লিখে থাকতে পারলাম না ‘কিন্তু’। আশা করি পাঠক বিষয়টি বেশ গুরুত্বসহকারে নেবেন ‘কিন্তু’। এই যে এখন আমি এতগুলো ‘কিন্তু’ অকারণে ব্যবহার করলাম তারচেয়েও অনেক বেশিবার বিভিন্ন জ্ঞানীগুনী পন্ডিতরা বুঝে, না বুঝে ‘কিন্তু, কিন্তু’ উচ্চারণ করে চলেছেন।

আসলে ‘কিন্তু’ নিছক শব্দের ব্যবহার নয়; এটি আমাদের জনআলোচনার ভাষাগত মানের সূচক। একটি জাতি কীভাবে কথা বলে, তার ভেতরে সেই জাতির চিন্তার কাঠামোও ধরা পড়ে। আর সেখানে যদি অতিরিক্ত “কিন্তু” ঢুকে পড়ে, বুঝতে হবে যুক্তির জায়গায় শব্দ কাজ করছে।

বিদ্যুৎ থাকবে ‘কিন্তু’ ব্যবহারের মানুষ থাকবে না : ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু

“কিন্তু”: বিরোধসূচক সংযোজক, ফিলার নয়

ব্যাকরণগতভাবে “কিন্তু” একটি বিরোধসূচক অব্যয়। এর আগে একটি পূর্ণ বক্তব্য থাকবে, যার সঙ্গে পরবর্তী বক্তব্যের বাস্তব সংঘাত বা সীমা রয়েছে।

সঠিক ব্যবহার:
নীতিটি কাগজে ভালো। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে তা ব্যর্থ।

এখানে প্রথম বক্তব্য ও দ্বিতীয় বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট টানাপোড়েন আছে।

কিন্তু আমরা যা শুনছি তা ভিন্ন ধরনের:

আমরা উন্নয়নের পথে যাচ্ছি, কিন্তু মানে জনগণ বুঝতে পারছে না, কিন্তু আসলে বিষয়টা হলো…

এখানে “কিন্তু” কোনো বিরোধ তৈরি করছে না। এটি সময় নিচ্ছে, বাক্য জোড়া দিচ্ছে, চিন্তার ফাঁক ঢাকছে। ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি “ফিলার” বা “ডিসকোর্স মার্কার”-এ রূপান্তরিত হচ্ছে—যার কাজ যুক্তি নয়, বিরতি সামলানো।

কেন ‘কিন্তু’ ‘কিন্তু’ এত বাড়ছে

১. চিন্তার আগে কথা বলার সংস্কৃতি

অনেক বক্তা আগে চিন্তা করেন না, বলতে বলতে ভাবেন। ফলে বাক্য এগোতে থাকে, যুক্তি পিছিয়ে পড়ে। “কিন্তু” তখন হয়ে যায় মানসিক বিরতির সেতু। এটি বক্তাকে সময় দেয়, কিন্তু শ্রোতাকে বিভ্রান্ত করে।

২. কৃত্রিম ভারসাম্যের চেষ্টা

অনেকে মনে করেন, “কিন্তু” না বললে তাঁরা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হবেন। তাই জোর করে একটি বিপরীত বাক্য জুড়ে দেন।

এই সরকার অনেক কাজ করেছে, কিন্তু আমি বলছি না তারা ভুলমুক্ত।

এখানে কোনো প্রকৃত বিরোধ নেই। এটি অবস্থানকে নিরাপদ রাখার কৌশল।

৩. টিভি টক শোর সময়-সংকট ও আধিপত্য

টক শোতে কথা থামলে আবার সুযোগ পাওয়া কঠিন। তাই বক্তা বলেন,

কিন্তু… কিন্তু… কিন্তু…

এখানে “কিন্তু” আর ভাষার অংশ নয়; এটি সিগন্যাল: “আমি শেষ করিনি।” শব্দটি যুক্তির বদলে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

৪. যুক্তির কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা

অনেকেই জানেন না—একটি সুগঠিত যুক্তি দাঁড়ায় থিসিস, প্রমাণ ও বিশ্লেষণের ওপর। “কিন্তু” ব্যবহারের আগে থাকতে হবে একটি স্পষ্ট বক্তব্য এবং তার সঙ্গে বাস্তব ব্যতিক্রম। এই কাঠামো না থাকলে “কিন্তু” শুধু শব্দের জট তৈরি করে।

টক শোর ভাষায় “কিন্তু”: নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র

আজকাল টিভি টক শোতে “কিন্তু” চারটি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে—

  • কথা দখল করার কৌশল

  • সময় বাড়ানোর ফিলার

  • প্রতিপক্ষ থামানোর সংকেত

  • কৃত্রিম নিরপেক্ষতার ঢাল

দুর্বল উপস্থাপনার উদাহরণ:

আপনি বলছেন দেশের অর্থনীতি ভালো, কিন্তু মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু বিরোধীরা বলছে উন্নয়ন কাগুজে, কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন—আপনি কী বলবেন?

সমস্যা কোথায়?

তিনবার “কিন্তু”
একাধিক অভিযোগ
কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন নয়

অতিথি সহজেই পালাতে পারবেন।

একই বিষয় শক্তভাবে বলা যায় এভাবে:

আপনি বলছেন অর্থনীতি ভালো। গত এক বছরে নিত্যপণ্যের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

কোনো “কিন্তু” নেই। প্রশ্ন আছে, তথ্য আছে, চাপ আছে।

“কিন্তু” দিয়ে প্রশ্ন এড়ানো: আলোচকের কৌশল

এবার দেখা যাক আলোচকরা কীভাবে “কিন্তু” ব্যবহার করে প্রশ্ন এড়িয়ে যান। এটি অত্যন্ত প্রচলিত, কিন্তু কম আলোচিত।

কৌশল ১: প্রশ্নের আগে “কিন্তু” ঢুকিয়ে ফোকাস ভাঙা

উপস্থাপকের প্রশ্ন:
আপনার মন্ত্রণালয়ের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ বেড়েছে—এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আলোচকের উত্তর:
দেখুন, কিন্তু প্রথমেই বলতে চাই, এই সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বচ্ছ…

এখানে প্রশ্নের কেন্দ্রে ঢোকা হয়নি। “কিন্তু” দিয়ে মূল প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে নিজের বয়ান শুরু করা হয়েছে।

কৌশল ২: দায় এড়ানো

প্রশ্ন:
আপনি কি এই সিদ্ধান্তের দায় নেবেন?

উত্তর:
কিন্তু সিদ্ধান্তটা শুধু আমার ছিল না…

“হ্যাঁ” বা “না” নেই। দায় ছড়িয়ে দেওয়া হলো।

কৌশল ৩: প্রসঙ্গ পাল্টানো

প্রশ্ন:
আপনার দলের সময়ে বেকারত্ব বেড়েছে কেন?

উত্তর:
কিন্তু আগের সরকারের সময়ে তো পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল।

বর্তমানের প্রশ্ন অতীতে সরিয়ে নেওয়া হলো।

কৌশল ৪: নৈতিক উচ্চতায় ওঠা

প্রশ্ন:
এই আইন কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করছে না?

উত্তর:
কিন্তু দেশের নিরাপত্তা আমাদের আগে ভাবতে হবে।

এখানে আবেগ দিয়ে প্রশ্ন ঢেকে দেওয়া হলো।

এইসব ক্ষেত্রে “কিন্তু” হয়ে ওঠে ধোঁয়া—যার আড়ালে প্রশ্ন হারিয়ে যায়।

ভালো উপস্থাপকের ভাষা

ভালো উপস্থাপক মন্তব্য কম করেন, প্রশ্ন বেশি করেন। তিনি বলেন—

আমি আপনাকে থামাচ্ছি নির্দিষ্ট প্রশ্নে ফেরার জন্য। আপনি কি সরাসরি উত্তর দেবেন?

অথবা—

আপনি প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছেন। প্রশ্নটি ছিল নির্দিষ্ট।

এখানে “কিন্তু” নেই, কিন্তু কর্তৃত্ব আছে।

শ্রোতার দৃষ্টিতে সমস্যা

বারবার “কিন্তু” শুনলে শ্রোতা তিনটি বার্তা পায়—

বক্তা প্রস্তুত নন
যুক্তি পরিষ্কার নয়
শব্দ দিয়ে ফাঁক ঢাকার চেষ্টা চলছে

ভাষা যখন অস্থির হয়, চিন্তাও অস্থির হয়ে পড়ে। “কিন্তু”-র অতিব্যবহার সেই অস্থিরতার লক্ষণ।

বিকল্পের চর্চা

বাংলা ভাষায় বিকল্প কম নয়—

তবে
অথচ
তার পরও
যদিও
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো

সবচেয়ে বড় বিকল্প হলো—সুস্পষ্ট বাক্য। অনেক ক্ষেত্রে “কিন্তু” না লিখলেও বাক্য আরও শক্তিশালী হয়।

“কিন্তু” একটি শক্তিশালী শব্দ। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার তাকে দুর্বল করে। যুক্তির জায়গায় শব্দ দাঁড়ালে আলোচনার মান কমে যায়।

আজ আমাদের জনপরিসরে শব্দ বাড়ছে, বিশ্লেষণ কমছে; উচ্চারণ বাড়ছে, কাঠামো কমছে। যদি আমরা ভাষাকে শৃঙ্খলিত না করি, চিন্তারও শৃঙ্খলা থাকবে না।

সম্ভবত শুরুটা খুব ছোট জায়গা থেকে—
কথা বলার আগে ভাবা।
প্রশ্ন স্পষ্ট করা।
আর প্রয়োজন ছাড়া “কিন্তু” না বলা।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক

লন্ডন, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬