“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৯।। মনুষ্যত্বের শিক্ষা ছাড়া, বাকি সব শিক্ষার চাষাবাদ চলছে দেশে

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৯।। মনুষ্যত্বের শিক্ষা ছাড়া, বাকি সব শিক্ষার চাষাবাদ চলছে দেশে

মনুষ্যত্বের শিক্ষা ছাড়া, বাকি সব শিক্ষার চাষাবাদ চলছে দেশে

উৎসর্গ

“আগামী প্রজন্মের প্রতি—যাদের হাতে আমরা একটি মানবিক সমাজ রেখে যেতে চাই।”

দেশে শিক্ষার অভাব নেই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সনদ আছে, ডিগ্রি আছে, প্রযুক্তির শিক্ষা আছে। সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, ভালো ফল করানো এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতাও আছে। অথচ এত শিক্ষার পরও একটি প্রশ্ন ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে—আমরা কি মানুষ হওয়ার শিক্ষাটুকু দিচ্ছি?

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। চুয়াডাঙ্গায় পারিবারিক বিরোধের জেরে ১১ মাসের শিশুকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। খুলনায় ‘ভাত চুরি’র অভিযোগে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ এসেছে। আর একটি মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে কিশোর অপ্রতীমের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। রোজই এসব ঘটনা ঘটছে দেদারসে।

তিনটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি বিষয় একই—তুচ্ছ বিরোধ, ক্ষোভ বা সম্পদের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য যে অসীম, সেই বোধটি সমাজে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মূল্যবোধের এই শিক্ষা শুরু হওয়ার কথা পরিবারে। কিন্তু আজকাল অনেক বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য যেন জিপিএ-৫। ভালো ফল, ভালো স্কুল, নামী কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। প্রাইভেট শিক্ষক, কোচিং, বই—সব ব্যবস্থা করে অনেকেই মনে করেন দায়িত্ব শেষ।

কিন্তু সন্তানের শরীর কেমন আছে, মানসিক চাপ কতটা, সে কোনো ভয় বা হতাশার মধ্যে আছে কি না, তার সঙ্গে শেষ কবে মন খুলে কথা বলা হয়েছে—এসবও তো অভিভাবকত্বের অংশ।

সন্তানের পড়াশোনার পেছনে টাকা খরচ করা সহজ; তার জন্য সময় বের করা অনেক কঠিন।

দুঃখজনক হলো, অনেক বাবা-মায়ের সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই, কিন্তু আড্ডার সময় আছে। সন্তানের মনের খবর নেওয়ার সময় নেই, কিন্তু অন্যের সংসার নিয়ে পরচর্চার জন্য দীর্ঘ ফোনালাপ আছে। কে কী করল, কার ছেলে কোথায় পড়ছে, কার পরিবারে কী সমস্যা—এসব নিয়ে আগ্রহ আছে; অথচ নিজের ঘরে সন্তান ধীরে ধীরে কী ভাবছে, তা জানার আগ্রহ অনেক সময় কমে যায়।

এটি শুধু সময়ের অপচয় নয়; এটি পারিবারিক অগ্রাধিকারের সংকট। সন্তানের পেছনে শুধু টিউশন ফি আর বিলাস দ্রব্য কেনার জন্য টাকা দেওয়াটাই মূল কথা নয়। সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দেওয়াটাও বাবা-মার অপরিসীম দায়িত্ব বটে।

শিশুরা আমাদের উপদেশের চেয়ে আমাদের আচরণ থেকেই বেশি শেখে। বাবা-মা যদি অন্যকে অপমান করেন, সন্তানও তা স্বাভাবিক ভাবতে পারে। পরিবারে যদি রাগের ভাষা হয় আঘাত, সন্তানও সেই আচরণ শিখতে পারে। তাই নৈতিক শিক্ষা বইয়ের পাতায় আটকে থাকলে হবে না; সেটি ঘরের আচরণে দেখা যেতে হবে।

সমাজেও একই ঘাটতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ উঠলেই অনেকেই যাচাইয়ের আগেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেন। কোথাও পিটুনি, কোথাও গণধোলাই, কোথাও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। অথচ বিচার ব্যক্তির হাতে নয়, আইনের হাতে থাকার কথা।

আইন অপরাধ দমন করতে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেক তৈরি করতে পারে না। সেই কাজ পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজকে একসঙ্গে করতে হয়।

তাই সন্তানকে শুধু জিজ্ঞেস করা যথেষ্ট নয়—‘কত নম্বর পেয়েছ?’

কখনো জিজ্ঞেস করতে হবে—‘আজ কাউকে সাহায্য করেছ?’

শুধু বলতে হবে না—‘জিপিএ-৫ পেতেই হবে।’

বলতে হবে—‘ভালো মানুষ হওয়াটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।’

কারণ শিক্ষা মানুষের ক্ষমতা বাড়ায়; মনুষ্যত্ব সেই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার শেখায়।

তাই শিক্ষার হিসাব শুধু পরীক্ষার ফল, ডিগ্রি কিংবা চাকরির সংখ্যায় করলে চলবে না। দেখতে হবে—আমাদের সন্তান অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখছে কি না, দুর্বলকে সম্মান করছে কি না, মতের অমিল সহ্য করতে পারছে কি না, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না।

একটি দেশ কতজন উচ্চশিক্ষিত তৈরি করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই শিক্ষিত মানুষগুলো কেমন সমাজ তৈরি করছে—প্রশ্নটি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা জ্ঞান চাষ করছি, দক্ষতা চাষ করছি, ডিগ্রি চাষ করছি, প্রযুক্তি চাষ করছি। সন্তানদের পেছনে অর্থ ব্যয় করছি। কিন্তু মনুষ্যত্বের চাষ যদি অনাবাদি পড়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার সেই ফসল দিয়ে সমাজ কতটা সুন্দর হবে?

ভালো ফলাফল সন্তানের ভবিষ্যতের একটি দরজা খুলতে পারে। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে।

তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—

আমরা কতটা শিক্ষিত—তা নয়;
আমরা কতটা মানুষ?

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬