“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৭।। সিলেটের সম্ভাবনা ও সংকট: উন্নয়ন কোথায় আটকে আছে?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৭।।  সিলেটের সম্ভাবনা ও সংকট: উন্নয়ন কোথায় আটকে আছে?

উৎসর্গ

সিলেটের মাটি ও মানুষের প্রতি,

আর একটি সুন্দর, পরিবেশবান্ধব ও বৈষম্যহীন সিলেটের স্বপ্ন দেখা আগামী প্রজন্মের জন্য।

সিলেট মানেই সবুজ চা-বাগান, পাহাড়, নদী, হাওর আর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য জনপদ। প্রকৃতি দিয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য, ইতিহাস দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। প্রবাসী জনগোষ্ঠীও সিলেটকে যুক্ত করেছে বিশ্বের নানা প্রান্তের সঙ্গে। অথচ এসব সম্ভাবনার আড়ালে রয়েছে বন্যা, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশের অবক্ষয় ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা।

প্রশ্ন হলো, এত প্রাকৃতিক সম্পদ, ঐতিহ্য ও প্রবাসী আয় থাকা সত্ত্বেও সিলেটের মানুষকে কেন বারবার একই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়? কেন উন্নয়নের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নাগরিক দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান দেখা যায় না?

সিলেটের ইতিহাসও প্রাচীন। ‘শ্রীহট্ট’ নামে পরিচিত এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সাক্ষ্য মেলে সপ্তম শতাব্দীর নিধনপুর তাম্রশাসন এবং আনুমানিক ৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে। এসব নিদর্শন প্রাচীন জনজীবন, ভূমিব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় দেয়। এরও আগে এখানে জনবসতি ছিল বলে ধারণা করা হয়, যদিও সুনির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ প্রয়োজন। কৃষি, নদীপথ, বাণিজ্য, চা-শিল্প ও প্রবাসী যোগাযোগ সিলেটের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা: প্রকৃতির দুর্যোগ, নাকি পরিকল্পনার দুর্বলতা?

সুরমা ও কুশিয়ারা নদী, বিস্তীর্ণ হাওর এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢল সিলেটকে বন্যাপ্রবণ করেছে। অতিবৃষ্টির সঙ্গে দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো যুক্ত হলে দুর্ভোগ আরও বাড়ে।

বন্যায় বসতবাড়ি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়, বিপাকে পড়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।

বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। এজন্য নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন, আগাম সতর্কীকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

সিলেট নগরী: উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু পরিকল্পনা কতটা কার্যকর?

সিলেট নগরীতে জনসংখ্যা, যানবাহন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ নাগরিক জীবনকে কঠিন করে তুলছে।

আধুনিক নগরীর পরিচয় শুধু বহুতল ভবন কিংবা প্রশস্ত সড়ক নয়। প্রয়োজন কার্যকর পানি নিষ্কাশন, নিরাপদ ফুটপাত, সুশৃঙ্খল যান চলাচল ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায় পানি জমছে, কোথায় নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে মানুষের বাস্তব উপকারও মূল্যায়ন করা জরুরি।

নদী দখল, দূষণ ও পাথর উত্তোলন: প্রকৃতির ওপর বাড়তি চাপ

সিলেটের নদী, পাহাড়, পাথর ও জলাভূমি শুধু সৌন্দর্যের উৎস নয়, মানুষের জীবন-জীবিকারও অংশ। বর্জ্যদূষণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা এবং অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

জাফলংসহ পাথরসমৃদ্ধ এলাকার সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘন ভূমিরূপ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার ক্ষতি করতে পারে।

প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে হবে, তবে সেই সম্পদের ভিত্তি ধ্বংস করে নয়। প্রয়োজন পরিবেশগত মূল্যায়ন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা।

চা-শ্রমিকদের জীবন: সবুজের আড়ালে কঠিন বাস্তবতা

সিলেটের চা-বাগান সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু এই সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জীবনসংগ্রাম।

চা-শিল্প অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও শ্রমিকদের মজুরি, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি দেখতে হবে, শ্রমিক পরিবারের শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারছে কি না।

উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছাতে হবে। তাই চা-শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

পর্যটন আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা কতটা মানসম্মত?

জাফলং, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, চা-বাগান ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো সিলেটের পর্যটনশিল্পের বড় সম্পদ। কিন্তু পর্যটনের সাফল্য শুধু দর্শনার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না।

নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, মানসম্মত সেবা, সুশৃঙ্খল পরিবহন ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণও জরুরি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।

পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষ কতটা লাভবান হচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।

প্রবাসী আয় আছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা?

যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী সিলেটিরা এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ বহু পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে সহায়তা করে।

তবে প্রবাসী আয় থাকলেই স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরি, দক্ষতাভিত্তিক পেশা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

প্রবাসীদের বিনিয়োগ আকর্ষণে স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও সহজ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। আবাসন খাতের পাশাপাশি উৎপাদনশীল শিল্প, কৃষিপ্রযুক্তি, পর্যটন ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: উন্নয়নের মৌলিক শর্ত

একটি অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু আয় বা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।

সিলেটের প্রত্যন্ত এলাকা, হাওরাঞ্চল ও চা-বাগানসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জন্য এসব সেবা কতটা সহজলভ্য, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, শিক্ষার মান, শিক্ষকসংকট এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ দরকার।

তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুযোগ বাড়াতে পারলে সিলেটের উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় জবাবদিহি কোথায়?

সিলেটের সমস্যাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বন্যার সঙ্গে ভূমি ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতার সঙ্গে নগর পরিকল্পনা, পরিবেশদূষণের সঙ্গে আইন প্রয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষা ও বিনিয়োগের সম্পর্ক রয়েছে।

তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় বাস্তবতা ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। প্রকল্প শেষে দেখতে হবে, ব্যয় করা অর্থে মানুষের সমস্যার কতটা সমাধান হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

সিলেটের ভবিষ্যৎ: সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে

সিলেটের সম্পদ কম নয়। রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, চা-শিল্প, নদী-হাওর, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর শক্তিশালী যোগাযোগ এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা। কিন্তু সম্পদ থাকা আর সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো এক বিষয় নয়।

টেকসই উন্নয়নের জন্য বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলা, নদী-জলাভূমি সংরক্ষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলা এবং প্রবাসী বিনিয়োগকে উৎপাদনশীল খাতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

সিলেটের সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু সেই গর্ব তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষ বন্যা ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে সুরক্ষা পাবে, শ্রমিকেরা ন্যায্য অধিকার পাবেন, তরুণেরা কাজের সুযোগ পাবেন এবং প্রকৃতি তার ভারসাম্য নিয়ে টিকে থাকবে।

সিলেটকে ভালোবাসা মানে শুধু তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করা নয়; বরং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, সমাধানের দাবি তোলা এবং বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। একটি অঞ্চলের প্রকৃত গৌরব তার অতীত ঐতিহ্যের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া সম্পদেও।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২০ অক্টোবর, ২০২৬