ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৪ ।। বাংলাদেশের সম্ভাব্য বাজেট কি জনমুখী, নাকি জনপ্রিয়?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৪ ।। বাংলাদেশের সম্ভাব্য বাজেট কি জনমুখী, নাকি জনপ্রিয়?

উৎসর্গ

যাঁদের জীবনে বাজেটের বাস্তব প্রভাব পড়ে—মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, কৃষক, ছোট চাকরিজীবী

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আবারও এক বিশাল সংখ্যার আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে—৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট। সংখ্যাটি শুনতে যেমন বিস্ময়কর, রাজনৈতিকভাবে তেমনি আকর্ষণীয়। কারণ বড় বাজেট মানেই বড় স্বপ্ন, বড় প্রতিশ্রুতি এবং বড় উন্নয়নের গল্প। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশাল অঙ্কের ভেতরে সাধারণ মানুষের স্বস্তির জায়গা কতটুকু?

নতুন সরকার তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এখানে আছে সামাজিক নিরাপত্তা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন—সব মিলিয়ে এক ধরনের জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের ছবি। রাজনৈতিকভাবে এটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। বিশেষ করে নির্বাচনের পর জনগণকে দ্রুত দৃশ্যমান সুবিধা দেওয়ার চাপ যেকোনো সরকারের ওপরই থাকে।

কিন্তু অর্থনীতির একটি নির্মম বাস্তবতা আছে—সংখ্যা দিয়ে সবকিছু সাজানো যায়, বাস্তবতা দিয়ে নয়।

সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে? দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও চাপের মধ্যে, শিল্পখাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না, ব্যাংকিং খাত নাজুক, ডলারের সংকট পুরোপুরি কাটেনি, আর মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ে এত বড় উল্লম্ফন কতটা বাস্তবসম্মত?

অর্থনীতিবিদদের সংশয় এখানেই।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি বাজেটেই উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পরে দেখা যায়, সেই লক্ষ্য পূরণ হয় না। তখন সরকারকে ঋণ নিতে হয়, ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে হয়, কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিতে হয়। ফলে কাগজে যে উন্নয়নের ছবি আঁকা হয়েছিল, বাস্তবে তার অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে বাজেট ঘাটতি। ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি কোনো ছোট বিষয় নয়। সরকার যদি এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তাহলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। আর বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। অর্থাৎ মানুষ একদিকে সামাজিক সহায়তা পাবে, অন্যদিকে বাজারে গিয়ে সেই অর্থের ক্রয়ক্ষমতা হারাবে।

এ যেন এক হাতে সহায়তা দেওয়া, আর অন্য হাতে তার মূল্য কেড়ে নেওয়া।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি অবশ্যই মানবিক উদ্যোগ। দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এগুলো কি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করবে, নাকি সাময়িক রাজনৈতিক স্বস্তি দেবে?

একটি রাষ্ট্র কেবল ভাতা দিয়ে শক্তিশালী হয় না। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সুশাসনের মাধ্যমে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন সক্ষমতা। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ সরকার যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তার অর্ধেকও সময়মতো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাহলে আরও বড় এডিপি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কোথায়?

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প মানেই প্রায়শই ব্যয় বৃদ্ধি, সময় বৃদ্ধি এবং অদক্ষতা। রাস্তা নির্মাণে কয়েকবার ব্যয় বাড়ে, সেতু নির্মাণে সময় পেরিয়ে যায়, আর প্রকল্পের নামে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। এই বাস্তবতা পরিবর্তন না করে কেবল বাজেটের অঙ্ক বাড়ালে উন্নয়নের গতি বাড়ে না।

তবুও এই বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক আছে। সরকার অন্তত সামাজিক সুরক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, আঞ্চলিক ভারসাম্য—এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী কিছুটা উপকৃত হতে পারে। কিন্তু শর্ত একটাই—দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট কেবল অর্থের অভাব নয়; সুশাসনের অভাব।

যে দেশে প্রকল্পের টাকার বড় অংশ মাঝপথে হারিয়ে যায়, যে দেশে ব্যাংক লুটের বিচার শেষ হয় না, যে দেশে করের বোঝা মূলত সৎ করদাতার কাঁধে পড়ে—সেই দেশে বড় বাজেট মানেই বড় উন্নয়ন নয়।

বাজেট আসলে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলিত হয়। এই বাজেট বলছে, সরকার জনমুখী হতে চায়। কিন্তু জনমুখী হওয়া আর জনপ্রিয় হওয়া এক জিনিস নয়। জনপ্রিয়তার জন্য বড় অঙ্ক ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু জনগণের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা কঠিন।

শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ একটি বিষয়ই দেখতে চায়—বাজারে গেলে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় কি না, চাকরি পাওয়া যাচ্ছে কি না, চিকিৎসা ব্যয় কমছে কি না, আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা হলেও কমছে কি না।

বাজেটের অঙ্ক নয়, মানুষের স্বস্তিই হবে শেষ বিচার।

লেখক : সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

১৭ মে, ২০২৬