কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৪ ।। ছন্দের তালে: শুনতে এক, অর্থে দুই—বাংলার জোড়া শব্দের দুষ্টু খেলা
উৎসর্গ
“বাংলা ভাষা ভালোবাসা এবং শুদ্ধভাবে লিখতে চাওয়া সকলের জন্য।”
ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষার জন্য বাঙালির মন করে আনচান। বাংলা বলে বলে অনেকে হন পেরেশান। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে দিয়েই ফুল। লিখেন শত শত বাংলা শব্দ ভুল। আজকাল বিভিন্ন সংগঠনের গ্রুপে, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকেই দু’কলম লিখে হাতের জোশ মেটাতে চান। কারণ হাতের জোশ মেটাতে মন করে আনচান। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এদের অনেকেই বাংলা শব্দকে ইচ্ছে মতো ব্যবহার করেন। ইচ্ছেমতো শব্দটাকে জ্যান্ত মারেন। যেখানে খুশি, একটি বানান লিখেই খালাস। মনে হয়, ওরা ওই শব্দের বানান বা অর্থ নিয়ে, করেন না কোনো তথ্য-তালাশ । অনেকে বুঝতেই পারেন না যে উচ্চারণে এক হলেও, লেখা বানানটি আসলে সেই অর্থ বহন করছে কি-না। এমনকি অনেক সময় পুরো বাক্যের মানেই উল্টো হয়ে যায়। অনেকেই লিখতে লিখতে হয়ে গেছেন বুড়া। কিন্তু বোঝেন না শব্দের জোড়া। তাই এ নিয়ে আজকে লিখছি থোড়া থোড়া।

মাঝে মাঝে দেশে-বিদেশে কিছু কবি/সাহিত্যিকের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, ভাব বিনিময় হয়। কেউ কেউ নিজের কবিতা পড়ে শোনান। কেউ কেউ ‘একটু দেখে দিতে’ অনুরোধ করেন তাদের লেখা। এভাবে প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়েছে। আবার অনেককে দেখি দাবি করেন, তিনি চল্লিশ/পঞ্চাশ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সাথে জড়িত। ভাল কথা, সিনিয়র মানুষ নি:সন্দেহে। কিন্তু যখন আধা পৃষ্টার কিছু একটা লিখেন তখন দেখা যায় বেশিরভাগ বানানই ভুল। এমনকি বাক্যগঠনও হয়নি ঠিকমতো। কবিতার ‘ক’ হয়নি, অথচ নিজেকে দাবি করছেন ‘কবি’ বলে। জিজ্ঞাসা করলে জবাব তৈরি, ‘আরে ভাই বিদেশে এসে বাংলাটা অনেক ভুলে গেছি আজকাল’। ঠিক আছে, তাহলে ইংরেজিতই লিখুন’। তখন ঐ পক্ষের রীতিমতো ঘেমে যাবার অবস্থা হয়। তাহলে ইংরেজিটাও হচ্ছে না ঠিকমতো। অথচ এঁরাই আজকাল দাপট দেখাচ্ছেন অবিরত। তাই আজকের এই কলাম লিখতে হলাম রত।

আসলে আমরা সকলেই এসব জোড়া শব্দ, বাগধারা ইত্যাদি স্কুলে শিখেছি, এবং এখনো বেশ মনে আছে। আমার জীবনের প্রথম পড়ার বই হচ্ছে ‘আদর্শ লিপি ও বর্ণ পরিচয়’। আমি ঘরে থেকেই পাঠশালা পাশ করেছি। ভর্তি হয়েছি একসাথে ক্লাশ সিক্সে সিলেট শহরের জিন্দাবাজারের দি এইডেড হাইস্কুলে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে তো শুধু ঐ পড়াই রিপিট করেছি। আশ্চর্য লাগে, অনেকে দাবি করেন বিএ, এমএ ইত্যাদি পাশ করে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের লেখা, পড়া বা আবৃত্তি শুনলে মনে হয়—ভাষার বেসিক জ্ঞানই কাঁচা।
বাংলা ভাষা বড়ই দুষ্টু। কানে যা শোনায় এক, কলমে তা আর এক। আমরা দিব্যি বলি, “শোনায় তো একই রকম!”—কিন্তু লিখতে বসলে দেখি অর্থ একেবারে উল্টো ঘরে চলে গেছে। এই নিয়েই আজ একটি মজার আলোচনা।
ধরা যাক, কেউ বললেন—“অবিরাম দেখছি তোমার সৌন্দর্য!” তিনি আসলে প্রশংসা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অবিরাম মানে থামছেই না। সৌন্দর্য যদি কলের পানির মতো অবিরাম ঝরে, তাহলে আলাদা কথা। তিনি লিখতে চেয়েছিলেন অভিরাম—মানে মনোহর, উপভোগ্য। একটি বর্ণের ভুলে প্রশংসা গিয়ে দাঁড়াল বন্যায়।
একজন বন্ধু অফিসের নোটিশে লিখলেন—“দ্বীন রাত পরিশ্রম করতে হবে।” পাশের সহকর্মী হেসে বলল, “এ কি হঠাৎ অসহায় রাতের কাজ?” আসলে লেখক লিখতে চেয়েছিলেন দিন। আর দ্বীন মানে অসহায় বা ধর্মভীরু। একটি ‘ব’ এসে সময়কে মানুষ বানিয়ে দিল। বন্ধু লিখলেন, ‘আমি আশী টাকা দিয়ে জুতা কিনেছি’। তার মানে তিনি ’সাপের দাঁত’ কিনেছেন। কারণ আশি মানে আশি টাকা, আর আশী মানে সাপের দাঁত। কেউ লিখলেন, ‘আমি তার বাসায় পাণি পান করলাম। তার মানে দাঁড়াচ্ছে সেদিন তার ঘরে আপনি তার হাত খেয়েছেন। কারণ ‘পাণি’ মানে হচ্ছে হাত।
কেউ নদীর খবর লিখতে গিয়ে লিখলেন—“নদীর এ কুল ভাঙে ওকুল গড়ে।” একজন পাঠক বললেন, “ফলের বাগান ভেসে গেছে নাকি?” প্রকৃতপক্ষে দরকার ছিল কূল—নদীর তীর। কুল আর কূল—উচ্চারণে কাছাকাছি, কিন্তু অর্থে আলাদা দুনিয়া। লিখতে গিয়ে কুল হয়ে গেল সব গন্ডগোল। সুতরাং কুল লিখতে গিয়ে কূল লেখাটা ভুল।
এক ভদ্রলোক চিঠিতে লিখলেন—“আপনার উপকার আমরা কখনও ভুলব না।” সহকর্মী মন্তব্য করল, “বাহ! কি উপকার!” কিন্তু যদি লিখতেন অপকার, তাহলে প্রশংসা মুহূর্তে অভিযোগ হয়ে যেত। উ-কার আর অ-কার এর এই খেলা বড়ই ভয়ংকর।
অনেকেই লিখেন—“গ্রহন করা হয়েছে।” শব্দটি দেখতে নিরীহ, কিন্তু শুদ্ধ রূপ হলো গ্রহণ। আবার পরিনাম, সিমা, স্রদ্ধা, দরশন—এগুলো এত প্রচলিত যে মনে হয় এদেরই নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত। অথচ শুদ্ধ রূপ হলো পরিণাম, সীমা, শ্রদ্ধা, দর্শন। বানানের সামান্য অবহেলা মানেই ভাষার মুখে কালি।
এক তরুণ লিখল—“তোমার আসা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশা।” এখানে ঠিক আছে। কিন্তু যদি উল্টো লিখত—“তোমার আশা আমার জীবনে হয়নি”—তাহলে মানুষ এসে দাঁড়াত প্রত্যাশার জায়গায়। আশা আর আসা—শুনতে প্রায় এক, কাজে একেবারে ভিন্ন।
কেউ বললেন—“কর্মই মানুষের পরিচয়।” ঠিক কথা। কিন্তু যদি লিখে ফেলেন করম, তাহলে হাতের তালু দিয়ে মানুষকে চেনার আয়োজন করতে হবে। কর্ম আর করম—দুটোই শব্দ, কিন্তু প্রসঙ্গ আলাদা।
আরও মজার হয় শীল আর সিল নিয়ে। একবার এক স্কুলের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল—“ছাত্রটির সিল ভালো।” বোঝাই যাচ্ছে, চরিত্র বলতে গিয়ে ইংরেজি seal-এর ছাপ মেরে দেওয়া হয়েছে। শীল মানে চরিত্র, আর সিল মানে ছাপ। একটিতে নৈতিকতা, অন্যটিতে দপ্তরির কাজ।
এক কবি লিখলেন—“সূর্যের করণ ছড়িয়ে পড়েছে।” পাঠক ভাবছেন, সূর্য আবার কী কাজ করল! দরকার ছিল কিরণ—আলোর রশ্মি। করণ মানে করা বা কার্যকারণ। সূর্য আলো দেয়, কাজের ফাইল জমা দেয় না।
কেউ লিখলেন—“তার অন্ন কেউ কাড়তে পারবে না।” ঠিক আছে, খাদ্যের কথা হলে। কিন্তু যদি লিখতেন—“তার অন্য কেউ কাড়তে পারবে না”—তাহলে বাক্যই ভেঙে পড়ত। অন্ন আর অন্য—একটি খাদ্য, অন্যটি ভিন্নতা।
আরও আছে—বিধান আর বিদান। সরকার বিধান দেয়—নিয়ম করে। কিন্তু বিদান মানে যন্ত্রণা (আঞ্চলিক ব্যবহারে)। সরকার যদি বিদান দেয়, তাহলে শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।
কখনো দেখি—“দীক্ষা” হয়ে যায় দিকশা, “নীতি” হয়ে যায় নিতি”, “অধিক” হয়ে যায় অধীক। এগুলো জোড়া শব্দ নয়, কিন্তু ভুলের জোড়া। এত প্রচলিত যে ভুলটাই শুদ্ধ মনে হয়। তারপর ধরা যাক ধন শব্দটি। যেমন ইলন মাক্স অনেক বড় ধনের মালিক। এখন ধ ওকার দিয়ে ধন লিখলে কি একই মানে হবে? নিশ্চয়ই নয়। তারপর ধরা যাক, কেউ লিখলো, ‘আমি এখন কাজে রথ। রথ মানে রথযাত্রা বা গাড়ি। আর কাজের রত, রথ নয়। মানে কাজে রত আছে এমন কেউ। এরপর ধরুন, ‘আমি তোমাকে স্মরণ করছি’। এখানে কেউ কেউ লিখে বসেন, আমি তোমাকে শরণ করছি। এই শরণ মানে হচ্ছে আশ্রয়। আজকাল প্রায়ই দেখছি জাতীয় পত্রিকাগুলোতে লিখছে, ‘তোমার জীবনের লক্ষ্ কি?’-এ জাতীয় বাক্য। লক্ষ মানে এক লাখ টাকা। শুদ্ধ হবে লক্ষ্য।
বাংলা ভাষা আমাদের কানে খুব দয়ালু। সে উচ্চারণে অনেক কিছু মেনে নেয়। কিন্তু চোখের সামনে এলে সে কঠোর। একটি মাত্র বর্ণ—য-ফলা, রেফ, দীর্ঘ-হ্রস্ব ই-কার—এসবই অর্থের দিকনির্দেশক।
আমরা যদি লিখি—“ধৈর্যের সিমা আছে”—ভাষা চুপ করে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাঁদে। কারণ তার সীমা আছে, কিন্তু অবহেলার সীমা থাকা উচিত নয়।
এই সব শব্দ আমাদের শত্রু নয়, বরং শিক্ষক। তারা শেখায়—শব্দের শরীর আছে, আর সেই শরীরের প্রতিটি অক্ষর অর্থ বহন করে। উচ্চারণে মিল থাকলেই অর্থে মিল হবে—এ ধারণা ভুল।
ভাষাকে ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়, শুদ্ধতাও। একটু সচেতন হলেই লেখা বদলে যায়। অবিরাম চর্চা করলে লেখাও অভিরাম হয়—এইটুকু পার্থক্য বোঝার মধ্যেই ভাষাজ্ঞান লুকিয়ে আছে।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১ মার্চ, ২০২৬।